সড়ক দুর্ঘটনা, কারণ ও তার প্রতিকার - বাংলা প্রবন্ধ রচনা

উপস্থাপনা ঃ 

বাংলাদেশে যতগুলো মৌলিক সমস্যা আছে, তার মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অন্যতম। ২০০১ সালের প্রথম ৬ মাসের জরিপে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে প্রতিদিন ৪ জন করে নিহত আর ২৩ জনের মতো আহত হচ্ছে। আর ২০১০ সালের জরিপে এ সংখ্যা দ্বিগুণ ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মধ্যে  ৫০ জন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন।

প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে আঘাতজনিত মৃত্যুর মধ্যে এটাই প্রধান কারণ।প্রতিদিন এ সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনকভবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার খবর । এই সড়ক দুর্ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ আমাদের নিরাপত্তার প্রধান হুমকি ।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ : 

সড়ক দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো :

১. অতিরিক্ত স্পীড় এবং ওভার টেকিং ঃ 

সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হচ্ছে, গাড়িগুলোর গতিসীমা । দুর্ঘটনা সংঘটিত এলাকার অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, অসাবধানতার সঙ্গে অতিরিক্ত স্পীডে অন্য একটি চলমান গাড়িকে ওভারটেকের চেষ্টাই দুর্ঘটনার কারণ। পুলিশ রিপোর্টেও বেশির ভাগ দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে অতিরিক্ত স্পীড এবং চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো ।

২. অপরিসর পথ : 

আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থাও অধিকাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। ঢাকা থেকে যাতায়াতে সবচেয়ে ব্যস্ত পথ ঢাকা-আরিচা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে । এ দুটি পথেই দুর্ঘটনা এবং হতাহতের সংখ্যা বেশি। ট্রাক, বাস, মিনিবাস, টেম্পো সব রকম দ্রুতগতি বাহনের সঙ্গে পদচালিত ভ্যান, রিকশা সবই চলাচল করে এই পথে। দ্রুত গতিসম্পন্ন গাড়ির সঙ্গে মন্থর গতির গাড়ির একত্রে চলাচল সত্যি বিপদজ্জনক ।

আরও পড়ুন :- পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার -রচনা [ Class - 6, 7, 8 ,9 ,10]- PDF

৩. ওভারলোডিং ঃ 

'ওভারলোডিং' মানে পরিমিতের বেশি মাল বহন করা। বেশি ওজনের মালামাল বহন করে গতি সীমা ছাড়িয়ে প্রতিটি ট্রাকই এক একটি যন্ত্রদানব হয়ে উঠে, যার গতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায়ই অসম্ভব হয়ে ওঠে চালকদের পক্ষে।

৪. আইন অমান্যকরণ ঃ 

এক জরিপে দেখা গেছে ৯১ শতাংশ চালক জেব্রাক্রসিংয়ে অবস্থানরত পথচারীদের অধিকার আমলই দেয় না । পাশাপাশি ৮৪ ভাগ পথচারী নিয়ম ভেঙে রাস্তা পার হয়। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ।

৫. জনসংখ্যার চাপ ও অপ্রতুল পরিবহন ব্যবস্থা ঃ 

এ প্রেক্ষিতে আমরা রাজধানীর দিকে দৃষ্টিপাত করতে পারি। সত্তর দশকে যেখানে ১০ লাখ লোকের বসবাস ছিল, সেখানে এখন প্রায় ১ কোটি লোকের বসবাস। জনগণের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানবাহন। এক হিসেবে দেখা যাচ্ছে, রাজধানীতে বর্তমানে প্রতি কিলোমিটারে ২৪৭ টির মতো গাড়ি চলে । 

ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার আওতাধীন মোট ২২৩১.৩০ কিলোমিটার সড়কে আনুমানিক গাড়ি চলাচল করে ৫ লাখ ৫০ হাজার। শুধু ঢাকা শহরেই নয়, সমগ্র বাংলাদেশেই গাড়ি ও জনসংখ্যা বাড়ছে দ্রুত হারে। ফলে বেড়ে যাচ্ছে দুর্ঘটনার হারও ।

৬. ট্রাফিক অব্যবস্থা : 

মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে ট্রাফিক ব্যবস্থা খুবই ত্রুটিপূর্ণ। সারাদেশে গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক পয়েন্টগুলোতে সর্বদাই দেখা যায় ত্রিমুখী সংযোগ নিয়ন্ত্রণ করা হয় । সে কারণে যেখানে চারটি বা পাঁচটি রাস্তা মিলিত হয়েছে, সেখানে চালকদের জন্য গাড়ি চালানো এবং গতি নিয়ন্ত্রণ করতে বেকায়দায় পড়তে হয় । সিগন্যাল লাইটগুলো বেশির ভাগই সমস্যাযুক্ত। 

আরও পড়ুন :- দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান রচনা ১৫ পয়েন্ট-Class 6,7,8,9,10| পিডিএফ

কোথাও বেশিক্ষণ লালবাতি জ্বলে, কোথাও সামান্য সময়। আবার ঢাকা শহরে অনেকগুলো পয়েন্ট আছে, যেখানে কোন বাতিই জ্বলে না বা নেই । রোড ডিভাইডার মার্কিং এবং জেব্রাক্রসিং মার্কিংও সব রাস্তায় যথাযথভাবে নেই । কাজেই ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং এ বিশৃঙ্খলা থেকেই ঘটে সড়ক দুর্ঘটনা ।

সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি ঃ 

সড়ক দুর্ঘটনার ফলাফল কেবল মানুষের মৃত্যুর ক্ষতি নয়, অপূরণীয় আরো অনেক ক্ষতির বোঝা চাপিয়ে দেয় সাধারণের জীবনে। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মানুষ প্রাণে বেঁচে থাকে বটে, কিন্তু জীবনের স্বাভাবিক গতি তারা হারিয়ে ফেলে চিরকালের মতো। পঙ্গুত্ব, শারীরিক বৈকল্য, যন্ত্রণা ও বেদনার ভার বহন করে বেঁচে থাকা সেসব মানুষের সংখ্যা আমাদের দেশে কম নয়। 

সড়ক দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতিও রয়েছে। এক হিসেবে দেখা গেছে সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে আর্থিক ক্ষতি দেড় হাজার কোটি টাকা । প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় হাজার কোটি টাকা। পুলিশের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার ৯৫৪ জন।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিকারের কতিপয় উপায়

গতি নিয়ন্ত্রণ ও ওভার টেকিং নিষিদ্ধ করা ঃ 

আমাদের দেশে ব্যস্ততম সড়ক হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম । অথচ এ রাস্তাগুলোর পরিসর খুব কম। তাছাড়া ঢাকা-আরিচা সড়কে আছে বেশ কিছু বিপদজনক সেতু। আর দেখা যায়, এ দুই হাইওয়েতেই দুর্ঘটনা ঘটে খুব বেশি। যার প্রধান কারণ হিসেবে পূর্বের চিহ্নিত করা গতিসীমা এবং ওভারটেকিং। তাই দুর্ঘটনা হ্রাসে এসব ব্যস্ততম সড়কগুলোতে ওভারটেকিং নিষিদ্ধকরণ এবং গাড়ির সর্বোচ্চ গতিসীমা বেঁধে দেয়া উচিত এবং এটা কার্যকর করার জন্য ভ্রাম্যমান ট্রাফিক পুলিশ দেয়া উচিত ।

আরও পড়ুন :- কর্মমুখী শিক্ষা বা কারিগরি শিক্ষা -রচনা [Class - 6, 7, 8 ,9 ,10]

সড়ক আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা : 

আমাদের দেশে যে সড়ক আইন আছে তা যদি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে দুর্ঘটনার পরিমাণ অনেক কমে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। কেননা সড়ক আইন প্রয়োগ করলে চালকদের মধ্যে একটা ভীতির সৃষ্টি হবে এবং চালকরা গাড়ি চালানোর সময় সাবধানতা অবলম্বন করবে।

লাইসেন্স প্রদানে জালিয়াতি প্রতিরোধ : 

লাইসেন্স প্রদানে জালিয়াতির আশ্রয় গ্রহণ করে কর্তৃপক্ষ অনভিজ্ঞ ডাইভারদের হাতে ছেড়ে দেন নিরীহ যাত্রীদের ভাগ্য । সড়ক দুর্ঘটনা রোধে লাইসেন্স প্রদানে জালিয়াতি রোধ করা আবশ্যক।

ফিটনেস সার্টিফিকেট প্রদানে অব্যবস্থা এবং সার্টিফিকেট ছাড়াই গাড়ি চালনা প্রতিরোধ ঃ 

মহানগরীতে সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন মোট ২২৩১.৩০ কিমি; সড়কে আনুমানিক ৫,৫০,০০০ গাড়ি চলাচল করে, যার মধ্যে রেজিস্ট্রিকৃত মটরযানের সংখ্যা ২,৫০,০০০টি অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি গাড়ির লাইসেন্স নেই। লাইসেন্সবিহীন গাড়ির মধ্যে অধিকাংশেরই রাস্তায় চলাচল উপযোগী ফিটনেস নেই, যার ফলে ঘটে দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা রোধে এর প্রতিরোধ আবশ্যক ।

পথচারীকে সতর্ক থাকতে হবে : 

পথচারীরা অনেক সময় প্রচলিত আইন অমান্য করে রাস্তা দিয়ে চলাচল করেন। শুধু তাই নয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ওভার ব্রিজ থাকা সত্ত্বেও তারা তা খুব কমই ব্যবহার করেন । তাছাড়া অনেক সময় পথচারীরা অসতর্কতার সাথে রাস্তা পার হন, যার দরুন অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। সুতরাং দুর্ঘটনা রোধে পথচারীকেও সতর্ক হতে হবে।

উপসংহার ঃ 

আমরা চাই সড়ক দুর্ঘটনা নামক সামাজিক সন্ত্রাসের মাধ্যমে নির্বিচারে মানুষ হত্যার প্রক্রিয়া বন্ধ হোক, চাই নিরাপদ সড়ক। এ লক্ষ্যে সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত আইনগুলো আরো কঠোর করে যুগোপযোগী করা হোক। সাথে সাথে পরিবহন ক্ষেত্রে দুর্নীতিকারীদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

শিক্ষাগার ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url