মাতা পিতার প্রতি কর্তব্য - রচনা ( ২০ পয়েন্ট )

উপস্থাপনা : 

প্রত্যেক সন্তানের জন্য মাতাপিতার ন্যায় পরম স্নেহশীল ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি আর কেউ নেই। তাদের উসিলায়ই আমরা এ সুন্দর পৃথিবীর মুখ দেখতে পাই। প্রত্যেক সন্তানের জন্যই তার মাতাপিতা বিধাতার পক্ষ থেকে এক পরম উপহার। তাই প্রত্যেক সন্তানের উচিত সাধ্যানুযায়ী তাদের সেবা করা ও দোয়া নেয়া।

অসহায় মানব সন্তান ঃ 

দশ মাস দশ দিন মাতৃগর্ভে অবস্থানের পর মানব সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় । ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মানব সন্তান কোনো কাজ-কর্ম করার, এমনকি নিজের খাদ্য খাবার যোগ্যতাও থাকে না। পরম স্নেহ ভালবাসা দিয়ে মা সদ্যপ্রসূত সন্তানকে লালন- পালন করেন। মা-বাবা সারাক্ষণ সন্তানকে আগলিয়ে রাখেন, যাতে একটি পিপীলিকা পর্যন্ত সন্তানকে দংশন করতে না পারে, সন্তানের একটু চিৎকার চোখের ঘুম হারাম হয়ে যায়। এ মায়ের ঋণ শোধ করার শক্তি নেই কোনো সন্তানের ।

পিতামাতার অবদান : 

পিতামাতার জন্যই সন্তান এই সুন্দর পৃথিবীর রূপ-রস, আরাম আয়েশ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছে। শিশুসন্তানের প্রতি পিতামাতার অবদান অপরিসীম ও বর্ণনাতীত। মা অতি কষ্টে দশ মাস দশ দিন সন্তানকে তাঁর গর্ভে ধারণ করেন। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই মা অসুস্থ ও দুর্বল শরীর নিয়ে সন্তানের সেবাযত্ন করেন। মাতৃস্তন্য পান করে শিশু বেঁচে থাকে। সন্তানের জন্য মায়ের চিন্তার যেন শেষ নেই।

সন্তানের শিক্ষা : 

একটু বড় হলেই মাতাপিতা সন্তানের শিক্ষার জন্য সচেষ্ট হন। সাধ্যমতো সন্তানকে সুশিক্ষা দিতে তাঁরা বিন্দুমাত্র ত্রুটি করেন না। সন্তান বিপথগামী হলে মাতাপিতা তাকে সুপথে পরিচালিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। বস্তুত আমরা আমাদের জন্ম, শিক্ষা-দীক্ষা সবকিছুর জন্যই মাতাপিতার নিকট ঋণী ।

আরও পড়ুন :- পিতা মাতার প্রতি কর্তব্য - রচনা [ Class - 6, 7, 8, 9 ,10 ]

কর্তব্যের প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব : 

মাতাপিতার কষ্ট, ধৈর্য, সাধনা ও শ্রমের ফলশ্রুতি হিসেবে সন্তানের সুন্দর জীবন গড়ে ওঠে। মা- বাবা যদি সন্তানের প্রতি অবহেলা দেখান তবে সে সন্তান কখনই যথার্থ মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারে না। যারা এ বিশ্বে নিজেদের জীবনের কল্যাণকর বিকাশ দেখিয়েছেন এবং বিশ্বের বুকে স্বীয় গৌরব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন তাঁরা শৈশবে সুযোগ্য মাতাপিতার স্নেহ ও শিক্ষায় লালিত-পালিত হয়েছেন।

মাতাপিতার মহান ও সীমাহীন অবদানের প্রেক্ষিতে তাঁদের প্রতি কর্তব্য পালন করে বা তাঁদের সেবা করে তাঁদের এই ঋণ পরিশোধ করা যায় না। মা-বাবার প্রতি কর্তব্য পালনের অর্থ তাঁদের সাধনার প্রতিদান দেওয়া নয়। তাঁদের ঋণ পরিশোধ্য নয় একথা বিবেচনা করেই তাঁদের সর্বাধিক সুখ-শান্তির ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাঁদের পূর্ণ সন্তুষ্টির দিকে সদাসর্বদা মনোযোগী হতে হবে।

মাতাপিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য : 

মাতাপিতার প্রতি কর্তব্য পালন যে কত গুরুত্বপূর্ণ তার প্রমাণ মানবজীবনের অখণ্ডনীয় দলিল কুরআন এবং মানব আদর্শের প্রতীক হাদীসে প্রমাণিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেন, “তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করো না এবং মাতাপিতার সাথে উত্তম আচরণ কর।” 

মহামানব হযরত মুহাম্মদ (স) বলেছেন, “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।” হিন্দু শাস্ত্রে মায়ের স্থান উল্লেখ করে বলেছে, “জননী এবং জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।” বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটকে আছে, “মাতাপিতার সেবা করাই সবচেয়ে উত্তম।

ধর্মগ্রন্থে মাতা-পিতার স্থান ঃ 

পৃথিবীর এমন কোনো ধর্মগ্রন্থ নেই, যেখানে মাতা-পিতার মর্যাদার কথা বর্ণনা নেই। সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মাতা-পিতাকে সন্তুষ্ট করেনি সে জগতের মধ্যে সর্বাপেক্ষা হতভাগ্য ব্যক্তি।” মা- বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় যদি কেউ শুধু মাকে সেবাযত্ন করে তবে তার জন্য বেহেস্তের একটি দরজা খুলে যায়, 

আর যদি মা-বাবা দু'জনকেই সেবাযত্ন করে তবে তার জন্য বেহেস্তের দু'টি দরজা খুলে যায়। কেউ যদি পিতা-মাতার কাউকে সেবাযত্ন না করে তবে তার জন্য বেহেস্তের দু'টি দরজাই বন্ধ হয়ে যায়। হিন্দু ধর্মে আছে, 'পিতা ধর্ম পিতা স্বর্গ । 

আরও পড়ুন :- প্রতিবেশীর প্রতি কর্তব্য - বাংলা প্রবন্ধ রচনা

মাতাপিতার প্রতি কর্তব্য পালনের মহান দৃষ্টান্ত : 

এই বিশ্ব চরাচরে আজ যাঁরা অমরত্বের স্বাদ নিয়ে মানব হৃদয়ে বেঁচে আছেন তাদের অধিকাংশেরই জীবন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁরা প্রত্যেকেই পিতৃ-মাতৃভক্তির এক একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হযরত বায়েজীদ বোস্তামি, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তি চিরকালই ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে দীপ্যমান।

এছাড়া, হযরত আব্দুল কাদির জিলানী, হাজী মুহম্মদ মহসীন, জর্জ ওয়াশিংটন ও আলেকজান্ডার প্রমুখ ইতিহাস প্রসিদ্ধ ব্যক্তিগণ মাতাপিতার প্রতি যে শ্রদ্ধাভক্তি দেখিয়েছেন, তা যুগ-যুগান্তরে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

মাতাপিতার প্রতি কর্তব্য : 

সন্তানের জন্য মাতাপিতার তুল্য শুভাকাঙ্ক্ষী দুনিয়াতে অন্য কেউ নেই। অতএব মাতাপিতার প্রতি সন্তানের অনেক কর্তব্য রয়েছে। এগুলো দু'ভাগে বিভক্ত করে আলোচনা করা হলো। যথা-

ক. জীবিত থাকা অবস্থায় কর্তব্য

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ : 

মাতাপিতা আমাদের কল্যাণের জন্য তাদের সর্বস্ব বিলিয়ে দেন। আচার-আচরণের মাধ্যমে তাই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে।

সদ্ব্যবহার : 

মহান আল্লাহ বলেন, তোমার আল্লাহ তোমাকে নির্দেশ দিয়েছেন তুমি যেন একমাত্র আল্লাহর ইবাদত কর এবং মাতাপিতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বেশি উত্তম আচরণ করতে হবে মাতাপিতার সাথে। মহানবী (স) বলেছেন, “তারা অর্থাৎ মাতাপিতা তোমাদের বেহেশত এবং দোযখ।”

আরও পড়ুন :- ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক - বাংলা প্রবন্ধ রচনা

পিতামাতার আনুগত্য করা : 

পিতামাতার আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে হবে, যদি না সে আদেশ শরীয়ত-পরিপন্থি হয়। এমনকি পিতামাতা যদি বিধর্মীও হন তথাপি তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা যাবে না ।

পিতামাতার আদব ও সম্মান রক্ষা : 

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, তুমি এমন ব্যবহার করবে না, যাতে তারা 'উহ' শব্দ উচ্চারণ করতে বাধ্য হয়। তাদের তিরস্কার করো না এবং তাদের সাথে সম্মানের সাথে কথা বলবে। সর্বদা তাঁদের সম্মানের দিকে নজর রাখতে হবে, সম্মানের সাথে আচরণ করতে হবে।

পিতামাতার খেদমত : 

সন্তান যখন বড় হয় তখন প্রায় পিতামাতাই কাজ-কর্ম করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এজন্য তাদের প্রয়োজনীয় কাজ করে দিতে হবে, তাদেরকে বেশি বেশি সেবা-যত্ন করতে হবে।

সন্তুষ্ট রাখা : 

রাসূল (স) বলেছেন, পিতামাতার সন্তুষ্টির মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতামাতার অসন্তুষ্টির মধ্যে আল্লাহর অসন্তুষ্টি। তাঁরা খুশী থাকলে ইহকাল-পরকাল সুন্দর হবে।

খ. ইন্তেকালের পর কর্তব্য

দোয়া ও কল্যাণ কামনা করা : 

পিতামাতা যখন ইহলোক ত্যাগ করবে, তখনো তাঁদের প্রতি কর্তব্য পালন করতে হবে। তাঁদের পরকালীন মুক্তির জন্য দোয়া এবং মাগফিরাত কামনা করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছেন আমরা যেন বলি, “হে প্রভু! তাঁদের ওপর রহমত কর, যেমন শিশুকালে তাঁরা আমাদের ওপর করেছেন।”

ওয়াদা, অসিয়ত ও ঋণ পরিশোধ করা : 

পিতামাতার কোনো ওয়াদা, অসিয়ত ও ঋণ থাকলে তাঁদের পরলোকগমনের পর তা সম্ভ নিদের আদায় করে দিতে হবে।

আত্মীয়দের প্রতি সদাচরণ : 

যেসব মাতাপিতার আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব রয়েছে তাদের সম্মান করতে হবে এবং তাদের সুপরামর্শ মেনে চলাও সন্তানের অন্যতম কর্তব্য। এ ব্যাপারে একটি হাদীস লক্ষণীয়। বনি সালেমা গোত্রের এক লোক একদিন রাসূল (স)-কে জিজ্ঞেস করলেন, পিতামাতার মৃত্যুর পর তাঁদের প্রতি সদাচরণ করার কোনো উপায় আমার জন্য অবশিষ্ট আছে কি? রাসূল (স) বললেন, হাঁ আছে। 

তাদের জন্য দোয়া করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাদের কৃত ওয়াদা পূরণ করা এবং সেসব আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, যে আত্মীয়তা তাদের ব্যতীত হতো না। আর তাদের বন্ধু-বান্ধবদের প্রতি সম্মান দেখানো ।

নেক আমল করা : 

সন্তানের অন্যতম কর্তব্য হলো বেশি বেশি নেক আমল করা। কেননা সন্তানের ভালো কাজের উসিলায় আল্লাহ তায়ালা তার পিতামাতাকে মাফ করতে পারেন। রাসূল (স) বলেছেন, নেক সন্তান সদকায়ে জারিয়ার মতো ।

উপসংহার : 

পিতামাতা সন্তানের জন্য আল্লাহর এক বিরাট নেয়ামত। এ নেয়ামতের সদ্ব্যবহার করে সন্তান তার জীবন সুন্দর করতে এবং পরকালীন মুক্তির পথ প্রশস্ত করতে পারে ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

শিক্ষাগার ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url