তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি - রচনা ( ২০ পয়েন্ট )

উপস্থাপনা :- 

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি। তথ্য ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নজিরবিহীন উন্নতির ফলে গোটা বিশ্ব আজ গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। বিশ্বায়নের প্রশস্ত আঙিনায় তথ্যপ্রযুক্তির বিশাল অবদানের ফলে সম্ভাবনাময় যে নয়া অর্থনীতির আদল গড়ে উঠছে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় এবং আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা কতটা প্রস্তুত সে ব্যাপারে পর্যালোচনা করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে সময়ের দাবি।

তথ্যপ্রযুক্তি কী :- 

আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে তথ্য সংরক্ষণ, সরবরাহ, সংযোজন, বিয়োজন করাই হলো তথ্যপ্রযুক্তি। এ বিষয়টির মাধ্যমে পৃথিবী তাবৎ তথ্যকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা হয়। কারণ তথ্যই সম্পদ- আর এ সম্পদের সঠিক ব্যবহার করতে শৃঙ্খলা অত্যাবশ্যক । সামগ্রিক তথ্যকে আধুনিক নানা দৃষ্টিকোণ থেকে প্রয়োজনমাফিক মানুষের সামনে পরিবেশন করাই তথ্যপ্রযুক্তির কাজ ।

তথ্যপ্রযুক্তির ধারায় বাংলাদেশ :- 

বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তির জিয়নকাঠির স্পর্শে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। গত দেড় যুগে এ দেশে তথ্যপ্রযুক্তির উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটেছে। তথ্যপ্রযুক্তি যে বাংলাদেশের জন্যও সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি, এ কথা আজ সবাই উপলব্ধি করছে।

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার :- 

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার যে জীবনযাত্রার মান বদলে দিতে পারে তা বিশ্বাস করতে এখন আর কেউ ভুল করছে না। তাই তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এ দেশে অনেক বেড়েছে। স্কুল থেকে শুরু করে সকল স্তরেই প্রতিনিয়ত কম্পিউটারের ব্যবহার বাড়ছে। সাইবার ক্যাফে স্থাপিত হচ্ছে। এ দেশে এখন ইলেক্ট্রনিক্স কমার্সের যাত্রা শুরু হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের লক্ষ্যে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন :- কম্পিউটার - রচনা ( ২০ পয়েন্ট )

সভ্যতার বিকাশে তথ্যপ্রযুক্তি :- 

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের জীবনমানের অগ্রগতির মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে আধুনিক সভ্যতা। সভ্যতার অগ্রযাত্রার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তথ্যপ্রযুক্তি। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার মানুষকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন এনে দিয়েছে। বিজ্ঞানের সব রকম চেষ্টা, চিন্তা, আবিষ্কার তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষের কাছে অতি দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে। 

আধুনিক যুগে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিবিদ্যা একই স্রোতধারায় আবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তিবিদ্যার কারিগরি জ্ঞান মানুষকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে। প্রযুক্তিবিদ্যাই সভ্যতাকে আধুনিক করে তুলেছে। মানুষের যখন যান্ত্রিক শক্তি অজানা ছিল তখন জীবনসংগ্রামে মানুষ শ্রমকেই আশ্রয় করেছিল । শস্য উৎপাদনে, হাতিয়ার নির্মাণে, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন দ্রব্যাদি যেমন- কাপড়-চোপড়, ঘরবাড়ি, তৈজসপত্র তৈরিতে মানুষ হাত ব্যবহার করত। 

পরবর্তীতে তা পরিবর্তিত হয়ে প্রযুক্তির আওতায় আসে। তখন স্বল্পশ্রমে স্বল্প সময়ে অধিক পণ্য উৎপাদন সম্ভব হয়। আধুনিক যুগে প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর বিকাশে পৃথিবীজুড়ে নবচেতনার সঞ্চার হয়েছে এবং তা পৃথিবীকে দ্রুত উন্নয়নের দিকে পরিচালিত করছে। তথ্যপ্রযুক্তি সেই অগ্রযাত্রাকে করছে আরও গতিশীল। বিজ্ঞানে প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ফলেই সভ্যতার ক্রমোন্নতি হতে হতে আজকের আধুনিক সভ্যতা গড়ে উঠেছে।

আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার :- 

প্রযুক্তি মানুষের উপকারী বন্ধুর মতো। আর তথ্যপ্রযুক্তি হচ্ছে মানুষের জীবনযাপনের অঙ্গ। তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করছে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ যেখানে মানুষ আছে, সেখানেই পৌঁছে গেছে বিজ্ঞানের কল্যাণের আলো। মানুষের মৌল-মানবিক চাহিদা পূরণের প্রয়োজনীয় উপাদানের জোগানে তথ্যপ্রযুক্তি নানাভাবে সহায়তা দান করছে। নিচে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের কয়েকটি দিক তুলে ধরা হলো।-

১. কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহ।

2. দেশ-বিদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উন্নয়নের অন্তরায়কে তুলে ধরা ।

৩. শিশু ও মায়ের মৃত্যুরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ সংক্রান্ত তথ্যাদি পরিবেশন করা । 

8. মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতামত ও পরামর্শ সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করা । 

৫. বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে, অর্থনৈতিক লেনদেন সূচক নিয়ন্ত্রণ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা।

৬. বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচয় ঘটিয়ে নিজস্ব সংস্কৃতির উন্নতি ও সমৃদ্ধি সাধনে সহায়তা করা।

৭. বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম তথ্য সরবরাহ ও পরিবেশন করা ।

৮. বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অগ্রগতির মূল বিষয় সম্পর্কে উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়ন কর্মীদের সচেতন ও সহায়তা দান করা ।

যোগাযোগ ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি :- 

আদিকাল থেকেই মানুষ একজন অন্যজনের সাথে, এক দেশ অন্য দেশের সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েছে। বিভিন্ন সময় তারা বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। কবি কালিদাস মেঘদূতের মাধ্যমে তাঁর প্রিয়ার কাছে প্রণয়বার্তা পাঠানোর কথা বলেছেন। ক্রমান্বয়ে চিঠিপত্রাদির প্রচলন হয়। সম্ভবত খ্রিষ্টপূর্ব ৩২২ অব্দে মৌর্যের রাজত্বকাল থেকে প্রশিক্ষিত পায়রা সংবাদ বহন করত। পরে ঘোড়া, রাজদূত, রানার এ কাজ করত। চিঠি মানুষের কাছে প্রামাণ্য দলিল বিধায় এখনও টিকে আছে। 

একসময় আধুনিক প্রযুক্তি হিসেবে ছিল টেলিগ্রাফ । বর্তমানে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ছোয়ায় যোগাযোগের জন্য এসেছে টেলিফোন, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ই-মেইল ৷ ফেসবুকের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে টেক্সট পাঠিয়ে যোগাযোগ করা যায়। বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষের সাথে অন্য প্রান্তের মানুষের যোগাযোগ রক্ষার জন্য ফোন করা যায়, কম্পিউটারে বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে বক্তা ও শ্রোতার ছবি এবং তার অবস্থান, মুভমেন্ট ইত্যাদি দেখা যায় ।

আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম হচ্ছে ইন্টারনেট। এর মাধ্যমে পৃথিবীর এক প্রান্তের কম্পিউটার থেকে অন্য প্রান্তের আর একটি কম্পিউটারে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ ও প্রেরণ করা যায়। পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িয়ে আছে ইন্টারনেট। ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ অনলাইনে বই পড়ে, দেশ-বিদেশের সাহিত্য সংস্কৃতির সাথে জ্ঞানের যোগাযোগ রক্ষা করছে। ই-মেইলের মাধ্যমে চিঠিপত্র আদান-প্রদান ও দরকারি ফাইল প্রেরণ করা যায় ।

শিক্ষা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি :- 

বিজ্ঞান প্রযুক্তির কল্যাণে শিক্ষা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে তার সুফল বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি। চিকিৎসাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আছে। মুহূর্তের মধ্যেই এ প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি, রোগনির্ণয় কৌশল এবং নতুন রোগ ও তার প্রতিকার সম্পর্কে সাধারণ মানুষ জানতে পারছে।

আরও পড়ুন :- কৃষিকাজে বিজ্ঞান - বাংলা রচনা  ২০ পয়েন্ট

বিনোদনে তথ্যপ্রযুক্তি :- 

বিনোদনের ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। রেডিও, টেলিভিশন, ডিভিডি, মোবাইল এখন বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। বর্তমানে প্রায় সব মোবাইল সেটেই বিবিসিসহ দেশি-বিদেশি বহু রেডিও স্টেশন থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠান শোনা যায়। ছবি তোলা যায়। মেমোরি কার্ড ব্যবহার করে গান, ভিডিও ইত্যাদি দেখা যায়। 

ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে দেশ-বিদেশের তথ্যচিত্র ও বিনোদন উপভোগ করা যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময়তা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা যায়। এক কথায়, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ঘরে বসেই প্রয়োজনীয় সব রকম আনন্দ-বিনোদন পাওয়া যায় ।

গবেষণা ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি :- 

বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি, কৃষি, চিকিৎসা প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতির পূর্বশর্ত হলো গবেষণা। এজন্য প্রতিটি দেশেই গড়ে উঠেছে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ইন্টারনেট বা কম্পিউটার নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্যের আন্তঃপ্রবাহ চলে আসছে। 

ফলে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক বিভিন্ন প্রকাশনা, জার্নাল, তথ্য, ফিচার প্রভৃতি আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে আমরা খুব সহজেই ঘরে বসে পেয়ে যাই। আর তা কাজে লাগিয়ে আমাদের গবেষণাধর্মী কাজ সম্পন্ন করে থাকি । 

তথ্যপ্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব :- 

তথ্যপ্রযুক্তিকে মানুষ নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে বর্তমানে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর অপরের সাথে পারস্পরিক মধ্যে ক্ষতিকর মারণাস্ত্র ব্যবহার করছে; দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে হানাহানি বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তির অন্যতম প্রধান মাধ্যম ইন্টারনেটের মাধ্যমে সাইবার অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। 

ব্যবহারকারী অনেক সময় নিজের আসল পরিচয় গোপন রেখে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে। এছাড়া পর্নোগ্রাফি চিত্রের মাধমে নৈতিক অবক্ষয় ঘটানো হয়। কেউ কেউ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন অপসংস্কৃতি চর্চায় মেতে ওঠে, যা আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ক্ষতিকর। কাজেই ইন্টারনেটসহ অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তিকে ইতিবাচক অর্থে ব্যবহার করতে হবে এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জনকল্যাণমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির ভূমিকা :- 

তথ্যপ্রযুক্তি খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিভিন্নভাবে অবদান রাখছে। দেশে কম্পিউটার সফটওয়্যার তৈরি বেশ বেড়েছে। প্রতি বছর প্রায় ২০০ কোটি টাকার সফটওয়্যার বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। ফলে আমাদের দেশের অর্থনীতির দ্রুত উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে।

আরও পড়ুন :- দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান - রচনা : (২০ পয়েন্ট ) | পিডিএফ

সম্ভাবনাময় সফটওয়্যার শিল্প :- 

বাংলাদেশে বর্তমানে সফটওয়্যার শিল্প সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে দেখা দিয়েছে। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট তিনটি ক্যাটাগরিতে হচ্ছে। এগুলো হলো কাস্টমাইজড সফটওয়্যার, মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার এবং ওয়েব সফটওয়্যার । বাংলাদেশ থেকে সফটওয়্যার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে রপ্তানি হচ্ছে। 

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প :- 

বিগত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে ঘটেছে অভাবনীয় সব পরিবর্তন। শিল্প, ব্যবসায় বাণিজ্য, অর্থনীতি এবং জীবনযাপন পদ্ধতিকে পাল্টে দিয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি। তথ্যপ্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর সাথে উন্নত দেশগুলোর এক ধরনের বৈষম্য ইদানিং আলোচিত হচ্ছে। ইংরেজিতে যাকে বলা হচ্ছে Digital Divide বা ডিজিটাল বৈষম্য।

আমাদের দেশের তরুণ শিক্ষিত সম্প্রদায় তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তাদের যোগ্যতা বারবারই প্রমাণ করেছে। তাই আমাদের তরুণদের মেধা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে দ্বাবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য কার্যকরী করে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা একান্ত প্রয়োজন-

ক. তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো ।

খ. গ্রামভিত্তিক লাগসই তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা ।

গ. জাতীয় তথ্য অবকাঠামো গঠন করা।

ঘ. টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা। ঙ. মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটানো ।

চ. তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিল্প, ব্যবসায় বাণিজ্য ও অর্থনীতি চালু করা।

ছ. তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালুকরণ ।

জ. তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষ সরকার ব্যবস্থা গঠন করা ।

তথ্যপ্রযুক্তি বিকাশের দায়িত্ব :-

তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের দ্রুত উন্নয়ন ও বিকাশের মূল দায়িত্ব নিতে হবে আমাদের দেশের সরকারকে। এজন্য যত রকমের আইনগত অবকাঠামো, অর্থ বরাদ্দ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার দরকার তা সরকারকে যথাসম্ভব কম সময়ে নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও এনজিও, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পপতিদেরকেও এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ঘটানো কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয় ।

তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেট :- 

বিশ্বব্যাপী আজ যে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সৃষ্টি হয়েছে তার মূল কারিগর ইন্টারনেট। ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমরা জুড়ে যাচ্ছি সমগ্র পৃথিবীর কম্পিউটারের সাথে। সাধারণ কোনো তথ্যের জন্য এখন ইন্টারনেটের বিকল্প নেই। খবরের কাগজ, গবেষণা জার্নালসহ নানা পুস্তকাদি মানুষ এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করেই পড়ে থাকে। কেনাকাটার সবচেয়ে বড়ো মাধ্যম এখন ইন্টারনেট । ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপ, ওয়াট্স অ্যাপ ইত্যাদির কল্যাণে বন্ধুত্ব, আড্ডাসহ সামাজিক যোগাযোগ এখন ইন্টারনেট নির্ভরতার পর্যায়ভুক্ত।

বিজ্ঞাপন বা নির্বাচনি প্রচারণা চালানোর জন্যে এখন ইন্টারনেটের সাহায্য নেওয়া হয়। দূর-দূরান্তে মানুষের নানা অজানা বিষয় আজ ইন্টারনেটের বদৌলতেই আলোর দেখা পাচ্ছে। এককথায় বলতে গেলে সরল কিংবা জটিল, সহজ কিংবা কঠিন, গুরুত্বপূর্ণ কিংবা তুচ্ছ, সব কাজই এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করে করা যাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে এর ব্যবহার তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, শিল্পীসহ নানা মানুষ তাদের যাবতীয় সৃষ্টিকর্মের কথা উপস্থাপন করছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে।

আরও পড়ুন :-  বিজয় দিবস - রচনা ( ২০ পয়েন্ট )

মোবাইল ফোন ও তথ্যপ্রযুক্তি :- 

দৈনন্দিন জীবনে মোবাইল ফোন একটি অতি প্রয়োজনীয় ও অত্যধিক ব্যবহার্য বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বর্তমানে টুথব্রাশ ব্যবহারকারীর চেয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারে মোবাইল ফোন অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। 

বর্তমানে মোবাইল ফোনের ব্যবহার শুধু কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্মার্ট মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদানের যাবতীয় কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। মোবাইল ফোনকে মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই কম্পিউটারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে তথ্য নিমেষেই মানুষের হাতের তালুতে বন্দি হয়ে যাচ্ছে।

তথ্যপ্রযুক্তির গুরুত্ব :- 

তথ্যই মানুষের সকল জ্ঞানের উৎস। তাই তথ্যের প্রবাহকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। তথ্যের মাধ্যমেই মানুষ অজানাকে জেনে সমৃদ্ধ হয়। মানুষের ভেতরের জ্ঞান স্পৃহাকে তথ্যের মাধ্যমেই সন্তুষ্ট করা সম্ভব। যেকোনো সমস্যাকে এখন সমস্যা হিসেবে না দেখে সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হয়। তা সম্ভব হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির এই অবাধ প্রবাহের কারণেই। তাই একবিংশ শতাব্দীর মানুষের জীবনে তথ্যপ্রযুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম।

তথ্যপ্রযুক্তির ভবিষ্যৎ :- 

দিনদিন তথ্যপ্রযুক্তি উৎকর্ষের পথ ধরেই হাঁটছে। যেভাবে এ সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে, ঠিক সেভাবেই বা তার চেয়ে উন্নততরভাবে ভবিষ্যতে তথ্যপ্রযুক্তিকে ব্যবহার করা হবে। আজ যাকে অসম্ভব বলে বোধ হচ্ছে কাল হয়তো তাকেই তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে সম্ভব করা যাবে। আশা করা যায়, পরবর্তীকালে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে আরও উন্নততর গবেষণা হবে এবং মানুষের কল্যাণে তা ব্যবহৃত হবে ।

উপসংহার :- 

এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, তথ্যপ্রযুক্তিই বর্তমান বিশ্বে সকল প্রকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূল হাতিয়ার। যে জ তথ্যপ্রযুক্তিতে যত বেশি দক্ষ, তাদের সার্বিক অবস্থাও তত বেশি উন্নত। আমাদের দেশে এখনো তথ্যপ্রযুক্তির পর্যাপ্ত ও যথা বিকাশ ঘটেনি। তাই দেশে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব ঘটানোর জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। অচিরেই বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তির ধা বিপ্লব ঘটিয়ে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত হয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশ্ব পরিমণ্ডলে নিজ অবস্থান সুদৃঢ় ও উজ্জ্বল করতে সক্ষম হ এটাই আমাদের ঐকান্তিক প্রত্যাশা ।

আপনার পছন্দ হতে পারে এমন আরও পোস্টের তালিকা

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

শিক্ষাগার ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url