শৈশব স্মৃতি - বাংলা প্রবন্ধ রচনা

ভূমিকা : 

জীবনটা আসলে কেমন যেন একটা নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা। আজ যে সুন্দর দিন বয়ে যাচ্ছে কাল তা স্মৃতির পাতায় জমা হচ্ছে। ঘড়ির কাঁটায় সময় এগিয়ে যাচ্ছে। অতীত একটি ইতিহাসের ছায়া হয়ে ভেসে উঠছে চোখের সামনে। একসময়ের শৈশব, কৈশোরকে মনে হয় আজ অনেক দিনের ঘটনা। কিংবা এই তো দেখতে দেখতে হারিয়ে গেল স্বপ্নময় সুন্দর সে রোমাঞ্চকর দিনগুলো।

শৈশব স্মৃতি : 

শৈশব স্মৃতি মানে শৈশবের সুখময় কিছু স্মৃতি। যখনই শৈশবের কথা মনে পড়ে আত্মবিস্মৃত হয়ে যাই আমি। আমার দৃষ্টিপথে শৈশব এসে দাঁড়ায়। আমি এই কোলাহলমুখর শহর ছেড়ে অতীতের দিকে চলতে থাকি। অসংখ্য ঘটনা এসে উকি মারে আমার স্মৃতির জানালায়।

শৈশবের কিছু ঘটনা অস্পষ্ট ও জীবন্ত : 

আমার শৈশবের প্রথম চার বছরের ঘটনা আমি পুরোপুরি বিস্মৃত হয়ে গেছি। কিন্তু যদ্দুর মনে পড়ে, আমি ছিলাম পরিবারের সকলের আদরের। বিশেষত আমার দাদীজান আমাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। তিনি প্রতিরাতে আমাকে রূপকথা, গল্প (যা আমি সত্য বলে ভেবে নিতাম) বলে ঘুম পাড়াতেন। আমার মনে পড়ে, তিনি তার বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক, ন্যায়নিষ্ঠ এবং বিনয়ী।

আমার শৈশব : 

আমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে সুন্দর সাজানো প্রকৃতির একটি শোভাময়— ছায়াময় গ্রামে। যার পাশে অবস্থিত ছোট উপশহর। গ্রামটির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বৈরাগী খাল। ভরা জোয়ারে বৈরাগীর কোল রূপকথার ছবির মতো অবস্থিত— এখানেই জন্মেছি আমি। 

আরও পড়ুন :- পিতা মাতার প্রতি কর্তব্য - রচনা [ Class - 6, 7, 8, 9 ,10 ] - PDF

কি অপূর্ব মায়াময়, ছায়াঢাকা, পাখিডাকা, সবুজ শ্যামলিমাময় আমার ‘খাটরা’ গ্রামখানি। যার সারাটা বুক জুড়ে আমি পেয়েছি পরিচ্ছন্ন আলো-বাতাস, ফুলের সৌরভ, গাছের ছায়া। সে আমাকে অকাতরে দিয়েছে প্রকৃতির ভালোবাসা, স্নেহমায়া ঠিক যেন আপন মায়ের মতো।

শৈশবের দিনগুলো : 

এখানেই কেটেছে আমার শৈশব ও কৈশোর। সে শৈশবের কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে আজো স্পষ্ট ভেসে ওঠে একটি কাঠের পুল, বাড়ির পাশের লম্বা তাল গাছের সারি। লম্বা মেঠো পথ। তার পাশেই বড় মাঠ। পুল পেরিয়ে দক্ষিণ দিকে আমেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শৈশবে সময়ে অসময়ে এ স্কুল মাঠে বিকেল হলেই ছুটে আসতাম। 

খেলার সাথিদের নিয়ে ঘুড়ি উড়াতাম। এপার ওপার বৈরাগীর কোল ঘেঁষেই সাথিদের বাড়ি। তারপর ফসলের ক্ষেত আর ক্ষেত। মটরশুঁটি আর সরিষার ক্ষেতে পৌষে আনন্দধারা বয়ে যেত। হলুদে হলুদে চারদিক মৌ মৌ করত। ক্ষেতের মাঝেই খেলতাম লুকোচুরি। মটরশুঁটির গা ঘেঁষে পালিয়ে থাকতাম। এভাবেই কেটে গেল আমার শৈশব।

কৈশোরের দিনগুলো : 

আমার কৈশোর কেটেছে এক অনাবিল আনন্দ সুমধুর কলতানে ভরা স্বপ্নিল রূপকথার মতো পরিবেশে। জীবনটা তখন ছিল একটা ছোট্ট ভাবনা নিয়ে। আমার আমি, পরিবার, খেলার সাথি, গাঁয়ের পথঘাট আর বৈরাগীর খালই ছিল আমার পুরো পৃথিবী। দু'চোখ জুড়ে তখন স্বপ্নময় জগৎ। 

মাঝে মাঝে মনে হতো আমি সব পেয়েছি। আমার পৃথিবী কতই না সুন্দর। সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে শাসনে বাঁধনে বাড়ির ভেতর ছুটাছুটি কিংবা বর্ণমালার পাঠ উল্টানো। তারপর ক্লাসে যাওয়া। দুপুরে বাড়ি ফেরা। একটু বিকেল হলেই সাথিদের কাছে ছুটে যাওয়া। দল বেঁধে ফুটবল খেলা ।

আরও পড়ুন :- আমাদের গ্রাম রচনা ক্লাস ৬, ৭, ৮, ৯, ১০ এবং HSC - PDF

পাঠশালায় গমন : 

শৈশব প্রান্তে পা রেখেই আমাকে যেতে হয় পাঠশালায়। শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত স্কুলেই ভর্তি হতে হয় আমাকে। প্রতিদিন পাঠশালার নিয়ম বাঁধনে আমি আবদ্ধ হতে থাকি। একমাত্র বোন আর আমি দু'জনে একসাথে স্কুলে যাওয়া। ফিরে আসা। বাড়ির শাসন মেনে চলা। ধীরে ধীরে এভাবে সময় ফুরাতে থাকে ৷

আনন্দঘন দিনগুলো : 

শৈশব-কৈশোরে কত কিছুই করেছি। সাথিদের নিয়ে বউ বউ খেলেছি, মিছেমিছি কত রান্না করেছি মাটি আর পানি দিয়ে। পুতুল বিয়ে দিয়ে দু'হাতে চোখ ঘঁষে কেঁদেছি। অবেলা স্কুল মাঠে ঘুড়ি উড়িয়েছি। সাথিদের সাথে করেছি মারামারি। আবার গলায় গলায় হাত দিয়ে করেছি বন্ধুত্ব। বৈরাগীর খালে সাঁতার কেটেছি সাথিদের নিয়ে। সরিষা ক্ষেত, মটরশুঁটিতে গড়াগড়ি দিয়েছি— দৌড়ে ফিরেছি ক্ষেতের কোল ঘেঁষে।

স্মৃতি তুমি বেদনা : 

মধুর জীবন যখন অতীতের ভাঁজ খুলে বসে, হৃদয় আঙিনায় সত্যিই তা হয় এক চরম বেদনার। হৃদয়টা হাহাকার করে ওঠে। বুক চিরে বেরিয়ে আসতে চায় চাপা দুঃখগুলো। বারবার মনে হয়- আহ! সে দিনগুলো যদি ফিরে পেতাম। 

কিন্তু জীবন তো চলে তার নিজস্ব গতিতে। দিনে দিনে সবকিছুর পরিবর্তন ঘটে। জীবন খুঁজে নেয় সম্মুখ গতি। এগিয়ে চলে অবিরাম। জীবনের ব্যস্ততা ঘিরে কর্মমুখর হয়ে ওঠা মুহূর্তগুলো চলে দিনরাত্রির মতো। ভোরের আলোয় ঘুম ভাঙে, ব্যস্ততা বাড়ে।

উপসংহার : 

জীবনটা আসলেই দু'দিনের খেলাঘর। নিরন্তর পাওয়া আর হারানোর বেদনার খেলা। তবু শৈশব এক অমূল্য স্মৃতি। সে চলে যায় ওপারে, অতীত হয়। আর ফিরে আসে না। অতীতের দীর্ঘশ্বাস নিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে যাই। আগামীদিনের কথা ভাবি। অতীত ঘিরে কখনো সূরের মূর্ছনায় গেয়ে উঠি-‘রইলো না, রইলো না, সেই আমার নানান রঙের দিনগুলি।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

শিক্ষাগার ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url