ঈমান ও ইসলামের মধ্যে পার্থক্য।এ দুটি সামর্থক নাকি বিপরীতার্থক

ঈমান ও ইসলাম আভিধানিক পার্থক্য :-

১. ঈমান (ايمان ) শব্দটি বাবে افعال -এর মাসদার। মূলশব্দ  امن এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে- বিশ্বাস স্থাপন করা, আনুগত্য করা, স্বীকৃতি দেয়া, নিরাপত্তা লাভ করা ।

পক্ষান্তরে  ইসলাম (اسلام)  শব্দটিও বাবে افعال এর মাসদার। মূলশব্দ سلم -এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে- বিনয়াবনত হওয়া, আত্মসমর্পণ করা ইত্যাদি ।

২. ঈমান (ايمان ) হলো মনের গোপন বিশ্বাস ও গোপনীয় আনুগত্য। আর ইসলাম (اسلام)  হলো বাহ্যিক আনুগত্য । 

৩. ঈমান (ايمان ) হলো আন্তরিক বিশ্বাসের নাম, আর ইসলাম (اسلام) হলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রকাশ্য আনুগত্য।

ঈমান ও ইসলাম পারিভাষিক পার্থক্য :-

ঈমান :- ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়, ইসলামের মূল বিষয়গুলোকে অন্তরে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা এবং তদনুযায়ী আমল করাকে ঈমান বলে। 

ইসলাম :- আল্লাহর প্রতি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে তার পূর্ণ আনুগত্য ও তার নিকট আত্মসমর্পণ করা। তার আদেশ-নিষেধ মেনে চলা এবং তার দেওয়া বিধান অনুসারে জীবনযাপন করাকে ইসলাম বলে। 

ঈমান ও ইসলামের অন্যান্য পার্থক্য :

১. ঈমানের সম্পর্ক হচ্ছে অন্তরের সাথে। পক্ষান্তরে ইসলামের -এর সম্পর্ক হচ্ছে 'অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাথে। যেমন মহান আল্লাহর বাণী- قَالَتِ الأَعْرَابُ امَنَّا قُلْ لَم تُؤْمِنُوا وَلكِنْ قُولُوا اَسْلَمْنَا .

২. কেউ বলেন, প্রকাশ্য আনুগত্যের নাম হচ্ছে ইসলাম আর গোপনে আনুগত্যের নাম হচ্ছে ঈমান l

৩. আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (র) বলেন- ঈমান হচ্ছে আম আর ইসলাম হচ্ছে খাস। 

৪. হাফেয ইবনে রজব হাম্বলী (র) বলেন-  ইসলাম ও ঈমান ফকির ও মিসকিনের ন্যায় দুটি বিশেষ্য। একত্রে আসলে পৃথক অর্থ দিবে। আর পৃথকভাবে আসলে একই অর্থ দিবে। মোটকথা, উভয়ের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য আছে 

৫. আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মতে- ঈমান ও ইসলাম, শব্দ দুটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এদের একটি থেকে অন্যটি আলাদা বিষয় নয়।

৬. ইসলাম গ্রহণকারীকে বলা হয় মুসলিম। পক্ষান্তরে ঈমান গ্রহণকারীকে বলা হয় মুমিন। 

৭. কেউ বলেন, সকল মুমিন মুসলমানের অন্তর্ভুক্ত হলেও সকল মুসলমান মুমিনের অন্তর্ভুক্ত নয় ৷

৮. ইমাম বুখারী (র) বলেন- ঈমান ও ইসলাম শব্দ দুটির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। এগুলো এক ও অভিন্ন। মুহাক্কিকীনের অভিমত হলো, প্রত্যেক মুমিন হচ্ছে মুসলিম, আবার প্রত্যেক মুসলিম হচ্ছে মুমিন। তাঁদের দলীল হলো মহান আল্লাহর বাণী- فَاخْرَجْنَا مَن كانَ فِيها مِنَ المُؤمِنِين فما وجدنا فِيهَا غير بَيتِ مِن المسلمين.

আরও পড়ুন :- আকাইদের মৌলিক বিষয় কয়টি ও কি কি? এবং আকিদার গুরুত্ব

ঈমান ও ইসলাম সমার্থক নাকি বিপরীতার্থক : 

ঈমান ও ইসলাম সমার্থক নাকি বিপরীতার্থক, এ ব্যাপারে প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরামের অভিমত নিম্নরূপ-

১. মুহাক্কিকগণের অভিমত : 

মুহাক্কিকগণের মতে- ঈমান ও ইসলামহলো বিপরীতার্থক। কেননা ঈমান  হচ্ছে অপ্রকাশ্য আনুগত্যের নাম আর ইসলাম হচ্ছে প্রকাশ্য আনুগত্যের নাম ।

বিজ্ঞজনেরা বলেন, ; ঈমান -এর সম্পর্ক হচ্ছে অন্তরের সাথে। আর ইসলাম -এর সম্পর্ক হচ্ছে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাথে।

এজন্য কুরআন মাজীদে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- এ قالت الاعراب امنا قل لم تؤمنوا ولكن قولوا اسلمنا অর্থাৎ, মরুবাসীরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি। বলুন, তোমরা ঈমান আনয়ন করনি; বরং বল, আমরা ইসলামগ্রহণ করেছি।

২. বুখারীসহ মুহাদ্দিস, দার্শনিক ও অধিকাংশ মুতাযিলার অভিমত : 

ইমাম বুখারীসহ জমহুর মুহাদ্দিস, দার্শনিক এবং মুতাযিলাদের অধিকাংশের মতে- ঈমান ও ইসলাম এক ও অভিন্ন। অর্থাৎ প্রত্যেক মুমিনই মুসলিম এবং প্রত্যেক মুসলিমই মুমিন ।

দলীল : তাঁদের প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বাণী- فَاخْرَجْنَا مَن كانَ فِيها مِنَ المُؤمِنِين فما وجدنا فِيهَا غير بَيتِ مِن المسلمين. অর্থাৎ, অতঃপর সেখানে যারা ঈমানদার ছিল, আমি তাদেরকে উদ্ধার করলাম এবং সেখানে একটি গৃহ ব্যতীত কোনো মুসলমান আমি পাইনি।

৩. আহনাফ ও খাত্তাবীর অভিমত :- 

ইমাম আবু হানীফা ও খাত্তাবী (র)-এর মতে, মুসলমান কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুমিন হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুসলিম নামধারী ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে মুমিন না হয়ে বরং শুধু অনুগত হয়। আর মুমিন অকাট্যভাবেই মুসলমান থাকে; কাফের হয় না। তাই মুসলিম ও মুমিনের মাঝে অবাধ সাধারণত্ব ও বিশেষত্ব)-এর সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলিম মুমিন নয়; বরং কোনো কোনো মুসলিম মুমিন। কিন্তু প্রত্যেক মুমিন অবশ্যই মুসলিম। মোটকথা, ইসলাম ব্যাপকার্থক আর ঈমান বিশিষ্টার্থক।

৪. মোল্লা আলী কারীর অভিমত :

মোল্লা আলী কারী (র)-এর মতে- ঈমান ও ইসলাম, -এর মধ্যে শরীর ও আত্মার সম্পর্ক।

৬. আইনীর অভিমত :-

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (র)-এর মতে, ঈমান ও ইসলামের মাঝে  ( আনুপাতিক সাধারণত্ব ও বিশেষত্ব)-এর সম্পর্ক রয়েছে। যেমন কতিপয় লোক মুমিন বটে; কিন্তু মুসলমান হবে না। কেউ অন্তরে বিশ্বাস করেছে ঠিকই কিন্তু তা প্রকাশ করার সময় পাওয়ার পূর্বেই সে মারা গেছে। তাহলে এ ব্যক্তি আল্লাহর নিকট মুমিন, কিন্তু মুসলমান নয় ।

৭. ইবনে হাজারের অভিমত :-

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (র) বলেন- ঈমান ও ইসলাম উভয়ে একত্রে থাকলে ভিন্নার্থে আর ভিন্ন ভিন্ন থাকলে একার্থে ব্যবহার হয় । সর্বোপরি বলা যায়, ঈমান ও ইসলামের মধ্যকার পার্থক্য বর্ণনায় হাফেয ইবনে রজব হাম্বলীর অভিমত, সর্বাপেক্ষা যুক্তিযুক্ত। আল্লামা শিব্বীর আহমদ ওসমানী (র) তাঁর অভিমতকে সমর্থন করেছেন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

শিক্ষাগার ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url