ছত্রাক কি? কাকে বলে। ছত্রাকের বৈশিষ্ট্য, গঠন এবং শ্রেণীবিন্যাস

ছত্রাক হলো ক্লোরোফিলবিহীন পরভোজী সমাঙ্গদেহি এক প্রকার নিম্নশ্রেণীর বৈচিত্রময় উদ্ভিদ।

সংজ্ঞা :- প্রকৃতকোষী, স্পোর বহনকারী, ক্লোরোফিলবিহীন জীব যারা সাধারণত যৌন এবং অযৌন উপায়ে বংশবৃদ্ধি করে, সুত্রাকার, শাখান্বিত বা শাখাহীন কখনো এককোষী যার কোষপ্রাচীরে কাইটিন বা সেলুলোজ বা উভয় উপস্থিত থাকে তাদেরকেই  ছত্রাক বলা হয়।

ছত্রাকের গঠন :-

ছত্রাকের দৈহিক গঠন :-

ছত্রাকের অঙ্গজ দেহকে থ্যালাস বলে । থ্যালাস এককোষী বা সূত্রাকার হয় ।

১। এককোষী থ্যালাস : 

অল্প কিছুসংখ্যক ছত্রাকের দেহ একটি মাত্র গোলাকার বা ডিম্বাকার কোষ দ্বারা গঠিত। এককোষী থ্যালাস নিম্নশ্রেণির ছত্রাকের বৈশিষ্ট্য। Ascomycetes শ্রেণির স্যাকারোমাসিটেসী গোত্রের অন্তর্ভুক্ত সকল এককোষী ছত্রাককে ঈস্ট বলে ।

২। সূত্রাকার থ্যালাস : 

অধিকাংশ নিম্ন ও উচ্চ শ্রেণির ছত্রাকের দেহ শাখা-প্রশাখাযুক্ত সূত্রাকার থ্যালাস দ্বারা গঠিত। এরূপ থ্যালাসের সমগ্র দেহটিকে মাইসেলিয়াম (mycelium) বলে। মাইসেলিয়ামের প্রত্যেকটি শাখাকে হাইফা (hyphae) বলে । বহুকোষী সূত্রবৎ মাইসেলিয়াল, ছত্রাককে মোল্ড বলে। মাইসেলিয়াম তথা হাইফার অভ্যন্তরে প্রস্থপ্রাচীর উপস্থিতির ভিত্তিতে মাইসেলিয়াম দুই প্রকার । যথা :

(i) প্রন্থপ্রাচীরযুক্ত মাইসেলিয়াম : 

সূত্রাকার হাইফার ভেতরে প্রস্থপ্রাচীর থাকার কারণে মাইসেলিয়ামু অসংখ্য কোষে বিভক্ত হয় এবং প্রত্যেকটি কোষে একটি বা দুটি করে নিউক্লিয়াস থাকে। এক নিউক্লিয়াস বিশিষ্ট কোষের সমন্বয়ে গঠিত মাইসেলিয়ামকে মনোক্যারিওটিক মাইসেলিয়াম এবং দুটি নিউক্লিয়াস বিশিষ্ট কোষের সমন্বয়ে গঠিত মাইসেলিয়ামকে ডাইক্যারিওটিক মাইসেলিয়াম বলে ।

আরও পড়ুন :- ছত্রাকের অর্থনৈতিক গুরুত্ব। ছত্রাকের উপকারিতা ও অপকারিতা

(ii) প্রস্থপ্রাচীরবিহীন মাইসেলিয়াম : 

হাইফার অভ্যন্তরে প্রস্থপ্রাচীর না থাকার কারণে মাইসেলিয়ামের সাইটোপ্লাজমে বহু সংখ্যক নিউক্লিয়াস বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকতে দেখা যায়। এরূপ বহু নিউক্লিয়াসবিশিষ্ট প্রস্থপ্রাচীরবিহীন মাইসেলিয়ামকে সিনোসাইটিক (Coenocytic) মাইসেলিয়াম বলে ।

ছত্রাকের কোষের গঠন :-

প্রকৃত ছত্রাকের প্রতিটি কোষ একটি দৃঢ় কোষপ্রাচীর ও প্রাচীর দ্বারা আবৃত প্রোটোপ্লাস্ট-এর সমন্বয়ে গঠিত ।

(ক) বিভিন্ন শ্রেণির ছত্রাকের কোষপ্রাচীর বিভিন্ন রকম। তবে অধিকাংশ শ্রেণির ছত্রাকের কোষপ্রাচীর গঠনের মুখ্য ( উপাদান কাইটিন নামক রাসায়নিক পদার্থ। এর ফর্মুলা (C22H54N4O21)n এবং এটি ছত্রাকীয় সেলুলোজ নামে পরিচিত। ছত্রাকের কোষপ্রাচীর পানি ও অন্যান্য দ্রবণের জন্য প্রবেশ্য।

কোষপ্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত সমুদয় সজীব পদার্থ একত্রে প্রোটোপ্লাস্ট নামে পরিচিত। প্লাজমা মেমব্রেন, এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম, মাইটোকন্ড্রিয়া, গলজিবস্তু ও গহ্বর সহযোগে গঠিত সাইটোপ্লাজম এবং নিউক্লিয়াস নিয়ে ছত্রাকের প্রোটোপ্লাস্ট গঠিত । ছত্রাকে কখনো প্লাস্টিড নামক অঙ্গাণু থাকে না। 

(খ) প্রোটোপ্লাস্ট : 
কোষপ্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত সমুদয় সজীব পদার্থ একত্রে প্রোটোপ্লাস্ট নামে পরিচিত। নিম্নে
প্রোটোপ্লাস্টের বিভিন্ন অংশ বর্ণনা করা হলো :

প্লাজমা মেমব্রেন বা কোষ পর্দা : 
কোষপ্রাচীরের ভেতরের দিকে কোমল, অত্যন্ত পাতলা, সজীব পর্দার নাম প্লাজমা মেমব্রেন। এটি কোষপ্রাচীরের সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত থাকে এবং কখনো কখনো ক্ষুদ্র পকেট বা থলির মতো গঠন তৈরি করে, তাকে লোমোসোম (Lomosome) বলে ।

সাইটোপ্লাজম : 
প্লাজমামেমব্রেন দ্বারা আবৃত বর্ণহীন জেলির ন্যায় পদার্থকে সাইটোপ্লাজম বলে। সাইটোপ্লাজম সজীব অঙ্গাণু জড় নিষ্ক্রিয় দ্রব্য এবং গহ্বরের সমন্বয়ে গঠিত। সজীব অঙ্গাণুর মধ্যে রয়েছে এন্ডোপ্লাজম রেটিকুলাম, মাইটোকন্ড্রিয়া ও রাইবোজোম। ছত্রাক কোষে কখনো প্লাস্টিড থাকে না। নিষ্ক্রিয় দ্রব্যগুলোর মধ্যে গ্লাইকোজেন, তেল, পিগমেন্ট এবং বিভিন্ন নিঃসৃত পদার্থ থাকে।
নিউক্লিয়াস : 
প্রতিটি ছত্রাক কোষে এক বা একাধিক নিউক্লিয়াস থাকতে পারে। ছত্রাকের নিউক্লিয়াস আকৃতিতে ক্ষুদ্র হয়ে থাকে। প্রতিটি নিউক্লিয়াস একটি নির্দিষ্ট সচ্ছিদ্র নিউক্লীয় পর্দা দ্বারা আবৃত ক্রোমাটিন স্ট্র্যান্ড নিউক্লিওলাসের সমন্বয়ে গঠিত।

ছত্রাক এর বৈশিষ্ট্য :-

  • (i) ছত্রাকের দেহ থ্যালয়েড বা সমাঙ্গদেহী অর্থাৎ ছত্রাকের দেহ মূল, কাণ্ড ও পাতায় বিভেদিত নয়।
  • (ii) ছত্রাক ক্লোরোফিলবিহীন উদ্ভিদ। তাই সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য প্রস্তুত করতে সম্পূর্ণরূপে অক্ষম এবং মৃতজীবী, পরজীবী বা মিথোজীবী হিসেবে জীবনধারণ করে।
  • (iii) ছত্রাকের অঙ্গজদেহ এককোষী অথবা সূত্রাকার, শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট, বহুকোষী মাইসেলিয়াম দ্বারা গঠিত 
  • (iv) কোষপ্রাচীর বিদ্যমান এবং প্রধানত কাইটিন দ্বারা গঠিত ।
  • (v) সঞ্চিত খাদ্য গ্লাইকোজেন ও চর্বি।
  • (vi) দেহ অভ্যন্তরে পরিবহনতন্ত্র অনুপস্থিত ।
  • (vii) প্রকৃত কোষী অর্থাৎ সুগঠিত নিউক্লিয়াস ও অন্যান্য অঙ্গাণু উপস্থিত।
  • (viii) অযৌন ও যৌন পদ্ধতিতে বংশবিস্তার করে। প্রধানত স্পোর উৎপাদনের মাধ্যমে অযৌন জনন সম্পন্ন হয় । 
  • (ix) যৌনাঙ্গ এককোষী অথবা বহুকোষী ।
  • (x) জননাঙ্গ চতুর্দিকে বন্ধ্যা কোষের আবরণে আবৃত থাকে না ।
  • (xi) বহুকোষী ভ্রূণ উৎপন্ন হয় না ।
  • (xii) মূলত স্থলজ তবে কিছু সদস্য সম্পূর্ণ জলজ পরিবেশে জন্মায় । অন্ধকার বা অল্প আলো ছত্রাকের পছন্দ।

ছত্রাকের শ্রেণীবিন্যাস

ছত্রাকের শ্রেণীবিভাগ যথাক্রমে দুই ভাগে বিভক্ত । যথাঃ

  1. সত্যিকারের ছত্রাক এবং 
  2. ছত্রাকের মতো জীব। 

সত্যিকারের ছত্রাকের উদাহরণ হলো-  

  • Zygomycota
  • Ascomycota
  • Asidiomycota
  • Deuteromycota 
  • Chytridiomycota

যদিও ছত্রাকের মতো জীবের উদাহরণ হল-

  • Myxomycota
  • Plasmodiophoromycota 
  • Omycota

FAQs

১। ছত্রাকের কোষপ্রাচীর কি দিয়ে গঠিত?
উত্তরঃ কাইটিন দ্বারা গঠিত। 

২। ছত্রাকের সঞ্চিত খাদ্য কি?
উত্তরঃ গ্লাইকোজেন ও তৈলবিন্দু। 

৩। নীল ছত্রাক কোনটি?
উত্তরঃ Penicillium 

৪। ছত্রাক বিদ্যাকে কি বলে?
উত্তরঃ Mycology

৫। ছত্রাক তত্ত্বের জনক কে?
উত্তরঃ আধুনিক ছত্রাক তত্ত্বের জনক Antony .

৬। অসম্পূর্ণ ছত্রাক কাকে বলে?
উত্তরঃ যেসব ছত্রাকের যৌন জন্য সম্পর্কে এখনো জানা যায়নি তাদেরকে অসম্পূর্ণ ছত্রাক বলা হয়। 

৭। একটি এককোষী ছত্রাকের নাম
উত্তরঃ ঈস্ট। 

৮। লাইকেনে শতকরা কত ভাগ ছত্রাকের উপস্থিতি থাকে ?
উত্তরঃ ৯০ - ৯৫ ভাগ। 

৯। মাথার টাক সৃষ্টিকারী ছত্রাক কোনটি?
উত্তরঃ Microsporum

১০। কোন ছত্রাক খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়?
উত্তরঃ Agaricus

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

শিক্ষাগার ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url