লাইকেন কাকে বলে? লাইকেনের বৈশিষ্ট্য এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব

সংজ্ঞা:- একটি শৈবাল প্রজাতি ও একটি ছত্রাক প্রজাতির মিথোজীবীরূপে নিবিরভাবে সহাবস্থানের ফলে গঠিত স্বতন্ত্র বিষমপৃষ্ঠ সমাঙ্গদেহী উদ্ভিদকে লাইকেন (Lichen) বলে। 

লাইকেনের প্রকারভেদঃ- 

প্রকৃতিতে বিভিন্ন আকৃতির লাইকেন পাওয়া যায়। বাহ্যিক গঠনভাবে লাইকেন তিন প্রকার। যথাঃ- 

১। ক্রাসটোজ (Crustose) লাইকেন : 

থ্যালাস অত্যন্ত পাতলা। দেখতে আবরণ বা স্তরের মতো মনে হয়। এদেরকে মাধ্যম হতে পৃথক করা যায় না। 

যেমন— Graphis, Lecanora, Scripta, Strigula, Cryptothecia rubrocinta, Diploicia canescens 

২। ফোলিয়োজ (Foliose) লাইকেন : 

এদের থ্যালাস চ্যাপ্টা পাতার মতো, পাতার কিনারা খণ্ডিত, মাধ্যমের সাথে রাইজয়েড সদৃশ রাইজাইন নামক অঙ্গের সাহায্যে যুক্ত থাকে। 

যেমন - Parmelia, Physcia, Flavoparmelia caperata, Parmotrema tinctorum, Xanthoria, Peltigera .

৩। ফ্রুটিকোজ (Fruticose) লাইকেন : 

এরা শাখা-প্রশাখাযুক্ত। খাড়া বা ঝুলন্ত দেহ, দেখতে অনেকটা গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদের মতো। 

যেমন- Usnea, Cladonia leporina, Letharia columbiana.

লাইকেনের বৈশিষ্ট্য :- 

লাইকেনের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। সেগুলো নিম্নরূপ:

  • ১। লাইকেন একটি দ্বৈত সংগঠন। কারণ একটি শৈবাল ও একটি ছত্রাক সদস্য মিলিতভাব এ সংগঠন তৈরি করে।
  • ২। ছত্রাক থ্যালাসের কাঠামো তৈরি করে এবং কাঠামোর ভেতরে শৈবাল আবৃত অবস্থায় থাকে ।
  • ৩। আকৃতিগতভাবে লাইকেন থ্যালয়েড, চ্যাপ্টা, বিষমপৃষ্ঠ অথবা শাখা-প্রশাখা যুক্ত হয় ।
  • ৪। এরা অধিকাংশই ধূসর বর্ণের তবে সাদা, কালো, কমলা, হলুদ ইত্যাদি বর্ণেরও হয়ে থাকে । 
  • ৫। এরা স্বভোজী তাই স্বয়ংসম্পূর্ণ ।
  • ৬। লাইকেনের উভয় জীবে অঙ্গজ ও অযৌন জনন ঘটে । কিন্তু যৌন জনন শুধুমাত্র ছত্রাক সদস্যের ঘটে। 
  • ৭। লাইকেন অনুর্বর বন্ধ্যা মাধ্যমেও জন্মে, যেখানে অন্য কোন জীব সম্প্রদায় জন্মাতে পারে না। 
  • ৮। মাটি গঠনে এরা অগ্রদূত হিসেবে ভূমিকা পালন করে।
  • ৯। থ্যালাসের নিচের দিকে রাইজয়েডের মতো রাইজাইন থাকে, যা দিয়ে পানি শোষণ করে।
  • ১০। এরা বায়ুদূষণের প্রতি উচ্চমাত্রায় সংবেদনশীল। 

লাইকেনের বাসস্থান (Habitat of Lichen) :-

লাইকেনের বিস্তৃতি বিশ্বব্যাপী। উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল, তুন্দ্রা অঞ্চল, বরফাবৃত মেরু অঞ্চল বা শুষ্ক মরুভূমি অঞ্চল যেখানে অন্য কোনো জীব সম্প্রদায় বেঁচে থাকতে পারে না, সেসব স্থানেও লাইকেন অতি সহজেই জন্মে থাকে। এরা সাধারণত মাটি, পুরাতন দেয়াল, গাছের বাকল, সজীব পাতা, ক্ষয়প্রাপ্ত কাঠের গুঁড়ি, পাথর, পর্বতগাত্র, হাড়-চামড়া, সমুদ্রতীর, মিঠা পানির হ্রদ বা নদী প্রভৃতি স্থানে জন্মায় ।

লাইকেনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব :-

উপকারিতা :

১। মাটি গঠন : 

নগ্ন পর্বত গাত্রে, শিলায় প্রথমে ক্রাসটোজ লাইকেন জন্মে পাথরে সূক্ষ্ম ফাটল সৃষ্টি করে। লাইকেন কর্তৃক নিঃসৃত CO2 এর সাথে বৃষ্টির পানি বা জলীয় বাষ্প মিশ্রণে কার্বনিক এসিড তৈরি হয় যা পাথর ক্ষয় করে। এছাড়া মৃত লাইকেনের দেহ এসব ক্ষয়ীভূত পাথর কণার সাথে মিশ্রিত হয়ে উন্নত উদ্ভিদ জন্মানোর উপযোগী হিউমাস সমৃদ্ধ মাটি গঠন করে।

২। মানুষের খাদ্য হিসেবে লাইকেন : 

কতিপয় লাইকেনে লাইকোনিন নামক শর্করা উপস্থিত থাকায় এটি মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নরওয়ে, সুইডেন ও আয়ারল্যান্ডের অধিবাসীরা Cetraria idandica নামক লাইকেন খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে । এছাড়া চীন, জাপান ও জার্মানে Endocorpon, দক্ষিণ ভারতে Parmelia, মিশরে Evernia নামক লাইকেন খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়।

আরও পড়ুন :- ছত্রাকের অর্থনৈতিক গুরুত্ব। ছত্রাকের উপকারিতা ও অপকারিতা

৩। পশু খাদ্য হিসেবে লাইকেন : 

তুন্দ্রা অঞ্চলের রেইনডিয়ার মস হিসেবে পরিচিত Cladonia rangifera নামক লাইকেনটি বল্গা হরিণ ও গবাদি পশুর প্রিয় খাদ্য।

৪। ঔষধের উৎস হিসেবে লাইকেন : 

জলাতঙ্কের ঔষধ হিসেবে Peltigera নামক লাইকেন এবং হুপিং কফ নিরাময়ের জন্য Cladonia নামক লাইকেন ব্যবহার হয়। এছাড়া জন্ডিস, ডায়রিয়া ও চর্মরোগের প্রতিষেধক হিসেবে লাইকেনের ব্যবহার রয়েছে।

৫। সুগন্ধি ও প্রসাধন সামগ্রী তৈরিতে লাইকেন : 

Evernia, Ramalina, Lobaria ইত্যাদি লাইকেন বিভিন্ন প্রসাধন সামগ্রী ও সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহার হয়ে থাকে।

৬। রং ও ট্যানিন উৎপাদনে : 

Cetraria, Lobaria লাইকেন হতে ট্যানিন পাওয়া যায় যা চামড়া ট্যানিংয়ে ব্যবহার হয়। Rocella হতে এক প্রকার রং সংগ্রহ করা হয় যা উলেন ও সিল্ক কাপড় রং করতে ব্যবহার হয়।

৭। উত্তেজক পদার্থ তৈরিতে : 

রাশিয়া, ফ্রান্স, সুইডেন প্রভৃতি দেশে ঈস্টের পরিবর্তে Usnea Ramalia প্রভৃতি লাইকেন অ্যালকোহল, বিয়ার ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহার হয় ।

অপকারিতা :

১। Cladonia, Usnea, Amphiloma-এর কোনো কোনো প্রজাতি আশ্রয়দাতা উদ্ভিদের ক্ষতি করে থাকে। 

২। কোনো কোনো বিষাক্ত লাইকেন খেয়ে মানুষ ও গবাদি পশু মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

৩। পুরাতন ইটের দেয়াল, দালানের ছাদ, মার্বেল পাথরের তৈরি সৌধে, কাচের জানালায় অবস্থানকারী লাইকেনের ক্রিয়ায় এ সকল স্থানের স্থায়িত্ব হ্রাস পায় ।

FAQs

১। কোন লাইকেন সরাসরি ভেজা কাঠের উপর জন্মায়?
উত্তরঃ Calicicum, Piptoporus .

২। লাইকেনের শতকরা কত ভাগ শৈবালে উপস্থিত থাকে?
উত্তরঃ ৫ - ১০ ভাগ। 

৩। ছত্রাকের সাথে মিলিত হয়ে লাইকেন কি তৈরি করে?
উত্তরঃ সায়ানোব্যাকটেরিয়া। 

৪। লাইকেন উদ্ভিদ হলো ?
উত্তরঃ মিথোজীবি। 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

শিক্ষাগার ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url